জেএমবিএফের গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা, অবিলম্বে আটক ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি
প্যারিস, ফ্রান্স | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভায় বর্তমান সরকারদলীয় অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব এবং যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে যুবদলের নেতা-কর্মীদের জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ ও শারীরিক হামলা এবং পরবর্তীতে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যসহ সারাদেশ থেকে আগত জাসদের ২৮৯ জন নেতা-কর্মী-সমর্থককে পুলিশ কর্তৃক আটকের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছে।
বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ও জেএমবিএফের নিজস্ব নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শনিবার রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, সংশ্লিষ্ট উপপুলিশ কমিশনার এবং পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করেই সভাটির আয়োজন করা হয়েছিল। জাসদ বাংলাদেশের একটি বৈধ রাজনৈতিক দল এবং দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
সভা চলাকালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব এবং যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে যুবদলের নেতা-কর্মীরা জোরপূর্বক জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করে সেখানে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের ওপর শারীরিক হামলা ও মারধর করেন।
পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জাসদ কার্যালয় ঘেরাও করে এবং সেখানে উপস্থিত জাসদের ২৮৯ জন নেতা-কর্মী-সমর্থককে আটক করে বিভিন্ন থানায় নিয়ে যায়। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে থাকা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যকেও পুলিশ আটক করে।
জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহানুর ইসলাম আটকের পর সাংবাদিক নেতা সূর্যের সঙ্গে প্যারিস সময় ১২:০৪ মিনিটে কথা বললে তিনি জানান, তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে জাসদ কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে তাঁকে পুলিশ আটক করে হাতে হাতকড়া বেঁধে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁকে সে সময় কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তা তিনি বলতে পারেননি। তিনি পুলিশকে তাঁর পরিচয় প্রদান করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন বলে জানালেও পুলিশ তাঁর কথার গুরুত্ব না দিয়ে তাঁকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলে বলে তিনি জানান। পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও জেএমবিএফ যোগাযোগ করতে পারেনি।
একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সভায় উপস্থিত থাকার কারণে কোনো সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী বা সাধারণ নাগরিককে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছাড়া আটক রাখা ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার সংক্রান্ত মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে জেএমবিএফ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
জেএমবিএফ মনে করে, একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত সাংগঠনিক সভায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ, শারীরিক হামলা ও মারধর এবং পরবর্তীতে সভায় উপস্থিত বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আটক করার ঘটনা বাংলাদেশের আইনের শাসন, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে, তাঁর পছন্দের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে এবং প্রযোজ্য সাংবিধানিক ব্যতিক্রম ছাড়া ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।
একইভাবে সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার, ৩৮ অনুচ্ছেদ সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক, বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
জেএমবিএফ দৃঢ়ভাবে মনে করে, কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক হওয়া, সেই দলের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা কিংবা শান্তিপূর্ণ সাংগঠনিক সভায় অংশগ্রহণ করা কোনো ব্যক্তিকে নির্বিচারে আটক বা গ্রেপ্তারের বৈধ ভিত্তি হতে পারে না।
বাংলাদেশ International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর রাষ্ট্রপক্ষ। চুক্তিটির অনুচ্ছেদ ৯ ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার এবং নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। অনুচ্ছেদ ১৯ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনুচ্ছেদ ২১ শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং অনুচ্ছেদ ২২ সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকার স্বীকার করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা নয়; বরং রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার সমভাবে রক্ষা করা।
জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহানুর ইসলাম বলেন: “একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের পূর্বনির্ধারিত সাংগঠনিক সভায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও মারধর এবং এরপর হামলার শিকার সভায় উপস্থিত সাংবাদিক নেতাসহ ২৮৯ জনকে পুলিশ কর্তৃক আটক করা বাংলাদেশের আইনের শাসন, মৌলিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করা একটি গণতান্ত্রিক ও অধিকারভিত্তিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, বর্তমান বিএনপি সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়ে যেভাবে পদ্ধতিগতভাবে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, তা নজিরবিহীন। আমরা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গণআটক, হয়রানি বা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান বন্ধ করতে এবং প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।”
জেএমবিএফের দাবিসমূহ
জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে:
১. সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যসহ আটক জাসদের বিভিন্ন স্তরের ২৮৯ জন নেতা-কর্মী ও সমর্থককে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়া হোক।২. আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাঁর আটকের সুনির্দিষ্ট আইনগত কারণ জানানো হোক এবং আইনজীবীর সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সব সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করা হোক।৩. রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে জাসদ কার্যালয়ে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ এবং জাসদ নেতা-কর্মীদের ওপর শারীরিক হামলা ও মারধরের ঘটনার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নেতৃত্বে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা হোক।৪. ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের ভিডিও, সংবাদমাধ্যমের ধারণকৃত ফুটেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ অবিলম্বে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হোক এবং হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা হোক।৫. রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনো গোষ্ঠীকে মব সৃষ্টি, বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন অথবা অন্য রাজনৈতিক দলের বৈধ সভা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জোরপূর্বক বাধা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হোক।৬. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা, জবাবদিহি ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হোক।৭. বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৭, ৩৮ ও ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং ICCPR-এর অধীনে স্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা হোক।
জেএমবিএফ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন, জাতিসংঘের মতপ্রকাশ সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদক, জাতিসংঘের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনকে ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণপূর্বক বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে।
ধন্যবাদান্তে—
মোসাঃ জান্নাতুল ফেরদৌস
সহকারী মহাসচিব
জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)
সিএনবি প্রাঙ্গণ, ১৮০ বুলভার্ড উসমান, ৭৫০০৮ প্যারিস, ফ্রান্স
ইমেইল: info@jmbf.org | ওয়েবসাইট: www.jmbf.org
ফেসবুক: jmbf23 | এক্স: JusticeMakersBF | লিংকডইন: jmbf23 | ইনস্টাগ্রাম: justicemakersbf
***************************************************
JusticeMakers Bangladesh in France (JMBF) is an independent, non-profit, non-partisan international human rights organization registered in France under the French Association Law of 1901 (Registration No. W931027714), committed to defending human rights, promoting social justice, and empowering communities in Bangladesh and beyond. JMBF is officially registered in the European Union Transparency Register (REG No. 0635235105176-78).
